সংবাদ শিরোনাম

শীত যেন কারো পৌষ মাস কারো সর্বনাশ !!!

Ad Code

 

নিউজ ডেক্সঃ শীত এসেছে । এ শীত যেন কারো পৌষ মাস কারো সর্বনাশ ।কথাটি এ জন্যই বলছি, শীত আসবে এই কথা চিন্তা করেই আমরা শীতকে ঘায়েল করবার জন্য অগ্রিম গরম কাপড় কিনে কিনে আলমারি ভর্তি করে ফেলি । বাক্স থেকে বের করি দামি দামি বিদেশি সব কম্বল । গায়ে দেয়া লেপটাকে মেরামত করে মোটা থেকে আরও মোটা করে তুলি । শীতে একটু আরাম পাবার আসায় । একটু গরম থাকার আশার। উন্নত সব মার্কেটে ঘুরে ফিরি গরম কাপড় কিনতে। হাতে মোজা, পায়ে মোজা, মাথায় টুপি তারপরও কেমন যেন শীত নিবৃত হয় না। অথচ সেই মানুষগুলো কেমন আছে? কেমন কাটছে তাদের এই শীত? তারা কীভাবে শীতের সঙ্গে লড়াই করে টিকে আছে? আমরা কি একবারও তা ভাবি ?

একটিবারের জন্যও যেন মনের ভিতর আসে না এমন ভাবনা। সহানুভূতি জাগে না হূদয়ের কোমল মন্দিরে । আমরা বড় স্বার্থপর হয়ে পড়েছি । আমাদের অর্থ সম্পদের পরিমাণ যতটা না বাড়ে তার থেকে শতগুণ বেশি হারে বাড়ে আমার মনের ভিতরের ঘৃণ্য কৃপনতা । অর্থ সম্পদ সামর্থ্য বাড়বার সঙ্গে সঙ্গে মনটা সংকুচিত হতে থাকে। আমরা হয়ে পড়ি আত্মকেন্দ্রিক। বারবার খুঁজে ফিরি সমমানের লোকদের । টার্গেট করি আরও বেশি উন্নত, উচ্চমানের লোকজনদের সঙ্গে ওঠাবসার। চারতলায় উঠতে কম করে আটটা সিড়ির ধাপ অতিক্রম করতে হয় । আমারা ভুলে যাই চার তলায় উঠতে এই আটটি ধাপের কোনোটিই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু খুব কম মানুষেরই এমন অভ্যাস আছে যে একটা ধাপ অতিক্রম করে পিছনে ফিরে দেখেন যে এই ধাপটা আমি অতিক্রম করলাম । বেশির ভাগই একটা অতিক্রম করতে না করতেই উপরে ধাপের দিকে তাকিয়ে থাকে। মনের ভিতর উঁচুতে ওঠবার লোভনীয় নেশা চরম থেকে চরমে উন্নীত হয় । এটাই যেন আমাদের স্বাভাবিকতা। 
আমরা দামি গাড়িতে করে রোজ রাতে ফুটপাতের গলি দিয়ে পার্টি হাউস থেকে আনন্দ ফূর্তি করতে করতে বাড়ি ফিরি, কিন্তু ভুলেও চেয়ে দেখি না ফুটপাতের পাশ দিয়ে খোলা আসমানের নিচে শুয়ে থাকা সর্বস্বান্ত মানুষগুলোকে। যাদের শরীরে কাপড়ের অপ্রতুলতা, নোংরা জায়গা, খোলা আকাশ, ফুটবলের মতো গোল হয়ে শীতের কষ্টে জর্জরিত মানুষগুলোর দিকে ভুলেও তাকাই না। দেখতে দেখতে এটা যেন কেমন একটা স্বাভাবিক বিষয় হয়ে গেছে । আমরা ভাবি ওরা এমন করেই এত কাল যাবত্ থাকছে । এখনও আছে এবং ভবিষ্যাতেও থাকবে । এটা নিয়ে ভাববার প্রয়োজনও মনে করি না । কারন আমরা যে চরম স্বার্থপর । 
মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। সমাজে সেই মানুষেরই একটা অংশ গরিব-দুস্থরা । তারা আমাদের সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার ন্যূনতম মৌলিক অধিকারগুলো তাদেরও ন্যায্য প্রাপ্য । তাই গরিব-অসহায়, দুস্থের প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা প্রদর্শন ও সহানুভূতিশীল হওয়া অত্যাবশ্যক।
আসুন আমরা মানবিক মূল্যবোধ থেকে সবাই মিলে শীতে ফুটপাতে বা খোলা আকাশের নিচে বসবাসকারী অসহায় ছিন্নমূল মানুষের পাশে সামর্থ্যের ভিত্তিতে সহযোগিতার হাত প্রসারিত করি। শীতার্থদের মধ্যে বেশি কষ্ট পাচ্ছে ছিন্নমূল পথ শিশুরা । দেখা যায় তাদের মধ্যে কেউ-কেউ প্লাস্টিকের বস্তা গায়ে দিয়ে শীতে কাঁপতে কাঁপতে রাত যাপন করছে। অনেকেই ছেড়া কাঁথা গায়ে দিয়ে রাত যাপন করছে। অনেকে আবার পথের ধারে খড়কুটো দিয়ে সামান্য আগুন জ্বালিয়ে আগুনের তাপে বসে বসে রাত পাড় করছে। কিছু হতদরিদ্র লোক রয়েছে যারা অর্থের অভাবে একটি শীতের কাপড়ও জোগাতে পারছে না। অসহায়দের একটাই আশা, সামর্থ্যবানদের নিকট থেকে তারা পাবে একটি গরম কাপড়। অসহায়দের কাছে এই মৌসুমটি খুবই কষ্টকর। যাদের গরম কাপড় নেই তাদের কাবু করে রেখেছে শীত। তারা থরথর করে কাঁপছে শীতের প্রভাবে। এই শীতে কষ্টের মধ্য দিয়ে তারা কোনোভাবে দিনাতিপাত করছে। যশোর শহরের বিভিন্ন জায়গায় গভীর রাতে সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, শহরের বিভিন্ন বিপণিবিতানের সামনের খালি জায়গা, রেল স্টেশন ও ফুটপাতে যেসব ছিন্নমূল লোকজন রাত যাপন করছে তাদের কষ্টের শেষ নেই। গরম কাপড়ের অভাবে তারা শীতের সঙ্গে যুদ্ধ করে কোনোভাবে রাত পার করছে। আর অপেক্ষা করছে পরদিন সকালের সূর্যের জন্য। কিন্তু সে সূর্যের দেখা মিলছেনা । 
ফুটপাত, বাসস্টপ, রেল স্টেশন, সদর ঘাট, হাসপাতালের সামনে এখানে ওখানে সেখানে কত না মানুষ শীতের সঙ্গে যুদ্ধে দিনের পর দিন পরাজিত হয়ে আসছেন । যাদের জয়-পরাজয় নিয়ে কখনো কোনো মিছিল মিটিং সামবেশ হয় না । যাদের বাঁচা-মরার খবর বাসি পচা ময়লা আবর্জনা আর পচা কলার খোসার সঙ্গে মিশে যায় । আর এদিকে আমরা বিএমডব্লিউ গাড়িতে চরে, এসি রুমে ঘুমিয়েও ভবিষ্যত্ নিয়ে চিন্তা করতে লিটার লিটার মদ খেয়ে সাবার করছি । নিজের প্রাপ্ত কোনো কিছু নিয়ে আমরা কখনো খুশি থাকতে পারছি না ।
তাই আসুন আমরা সবাই মনটাকে একটু নরম করে আর্তমানবতার সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করি। নিজের ভিতরে লুকিয়ে থাকা মানবতাকে বাইরে বের করে আনি । যে মুখগুলো না হাসতে হাসতে হাসির কথা ভুলেই গেছেন । যাদের মুখ নীরবে কাঁদে হাসি হারার বেদনায় সেই মুখগুলোতে হাসি ফোটায়। আপনার একটা পড়ে থাকা একটা শীতের কাপড় যেটা কি-না আপনার বাসার ফ্লোর মোছার কাজেও আসবে না সেইটা কিন্তু একটা মানুষের পুরা শীতকালটাকেই বিদায় করে দিবে। শীত যুদ্ধে জয়ী হবে বেদনার মুখ গুলো ।

No comments